Skip to content
দুর্গাপূজা ২০২৬
2026-09-26·পোস্ট

দুর্গাপূজা খরচ ২০২৬: একটি পুজো কমিটি আসলে কত টাকা খরচ করে

যে সংখ্যাটা কেউ মাস্টার বোর্ডে লেখে না

কমিটিকে জিজ্ঞেস করুন দুর্গাপূজায় কত খরচ হবে। সাধারণত মূর্তির দাম আর প্যান্ডেলের দাম, তার সঙ্গে একটা গোড়া সংখ্যা। তারপর বিজয়াদশমী এসে হিসাব উল্টে যায়। যেসব কমিটি বিপদে পড়ে, তাদের প্রায় সবাই একই তিনটি জিনিস বাদ পড়েছে — এবং মূর্তি সেই তিনটির একটি নয়।

এটি ২০২৬ সালে কলকাতার সর্বজনীন ও পাড়ার পুজোর জন্য একটি সূচক-নির্দেশক হিসাব। আপনার পুজো গড়ের নয় — এটিকে ফাঁকের কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করুন, নম্বর হিসেবে নয়।

স্তর অনুযায়ী কলকাতার পুজোর খরচ

  • পাড়ার পুজো: আনুমানিক ৫–২০ লক্ষ টাকা। মহল্লা বা হাউসিং-সোসাইটির পুজো, মূলত চাঁদায় চলে, প্যান্ডেল স্থানীয় স্কুল-ব্যান্ড বানায়।
  • ভিত্তি-সুরক্ষিত মধ্যবর্তী: আনুমানিক ২০–৫০ লক্ষ টাকা। আংশিক পেশাদার প্যান্ডেল, ভাড়া করা কারিগর, পাঁচ দিনের সম্পূর্ণ ভোগ।
  • বড় পুজো: আনুমানিক ৫০ লক্ষ থেকে ১ কোটি। পুরস্কার-প্রতিযোগী পুজো, পূর্ণ ধারণাগত থিম ও পেশাদার আর্ট ডিরেকশন।
  • মেগা: আনুমানিক ১–৩ কোটি। সংবাদে নিয়মিত চড়া সেই অল্প কিছু প্যান্ডেল, পেশাদার প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টসহ।

খরচের সঙ্গে সবচেয়ে কাছাকাছি যুগ্ম সম্পর্ক মূর্তির আকারের। সাধারণ ৪–৬ ফুট মাটি বা শোলাপিঠের দুর্গা প্রায় ২৫,০০০–৫০,০০০ টাকা। ৮–১২ ফুটে গেলে ৮০,০০০–২,০০,০০০। ১৫–২০ ফুটে ৩–৮ লক্ষ। ২০ ফুটের বেশি হলে প্রতি ফুটে লক্ষাধিক, আর তখন কাঠামোটাও বাড়াতে হয়।

এই বক্ররেখাটা খেয়াল করুন। মূর্তির উচ্চতা দ্বিগুণ করলে খরচ তার চেয়ে বেশি দ্বিগুণ হয়, আর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে প্যান্ডেল, ছাদ, পরিবহন আর বিসর্জনও। উচ্চতা কমিটির সবচেয়ে দামি সিদ্ধান্ত, আর সেটা সাধারণত হয় জুলাইয়ের প্রথম উত্তেজিত সপ্তাহে।

লাইন ধরে লাইন: টাকা আসলে কোথায় যায়

কলকাতার একটি মধ্যবর্তী পুজোর মোট বাজেটের সাধারণ ভাগ।

  • মূর্তি ও মাটির কাজ — ২০ থেকে ৩০%। দুর্গা, সঙ্গে মহালক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, শিব ও গণেশ যদি পরিবারটি পূর্ণ করে। শোলাপিঠের ফ্রেম, চুলের কাজ, ফিনিশিং আর প্যান্ডেলে পৌঁছে দেওয়া যোগ।
  • প্যান্ডেল নির্মাণ — ১০ থেকে ২০%। বাঁশ ও কাঠের ফ্রেম, ক্ল্যাডিং, ভাণ্ডর, পানি নিষ্কাশন আর নিরাপদ মেঝে। ফ্রেম পুনর্ব্যবহার করা স্বাভাবিক ও বুদ্ধিমান।
  • কারিগর ও শিল্পীর পারিশ্রমিক — ১০ থেকে ২০%। কুমারটুলির প্রতিমা-কারিগর বা থিমের কাজ করা আর্ট-ছাত্ররা। মরশুম শুরুর আগে বুক করুন; মরশুমে ডিমান্ডের দামে কিনতে হয়।
  • আলো ও ইলেকট্রিক — ৫ থেকে ১২%। প্যান্ডেলের আলো, ভাণ্ডরের আলো, সাউন্ড সিস্টেম, ইলেকট্রিশিয়ান আর ওয়্যারিং ইন্সপেকশন। জেনারেটর লাগলে সেটাও।
  • খাবার ও ভোগ বিতরণ — ১০ থেকে ২০%। পাঁচ দিন, কয়েক হাজার প্লেট, টিকিট ছাড়া আর মাথা না গুনে। এটিই সবচেয়ে কম হিসাব হওয়া খাত। নিচে দেখুন।
  • পুরোহিত, চণ্ডন ও সামগ্রী — ৫ থেকে ১০%। দিনভর পুরোহিতের পারিশ্রমিক, প্রতিদিনের ভোগ, পুষ্পাঞ্জলি, শোণ রাত, শেষ দিনের চণ্ডন।
  • ছাপা ও প্রচার — ৩ থেকে ৮%। ফ্লেক্স ও ব্যানার, চিঠি ও রসিদের বই, নিমন্তন, প্যান্ডেল ব্রুশুর, চাঁদার চিঠি, নোটিশ বোর্ডের লেখা। ছোট খাত, দেরিতে করলে চড়া।
  • বাদ্য ও ঢাকি — ৩ থেকে ৬%। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল না বুক করলে।
  • বিসর্জন ও ভাসানো — ৩ থেকে ৮%। ক্রেন, খোলা নৌকা বা ভ্যান, রাস্তা ছাড়ার কাজ, থানার সমন্বয়, ভাসানোর রাতের জন্য কর্মী।
  • জরুরি তহবিল — ৫ থেকে ১০%। কমিটি অপমান না হয় কিনা, তা ঠিক করে এই লাইনটি। শুরুতেই রাখুন, শেষে নয়।

হিসাব উল্টে দেয় এমন তিনটি খাত

১. খাবার ও ভোগ, মূর্তি নয়

সবাই প্যান্ডেলের হিসাব করে ভুলে যায় যে কলকাতার একটি সর্বজনীন পুজো পাঁচ দিন ধরে টিকিট ছাড়া, মাথা না গুনে যত জন আসেন সবাইকে খাবার দেয়। সাধারণ দিনে ছোট ভোগ আর অষ্টমী-নবমীতে বড় ভোগ নীরবেই অ্যাকাউন্টের দ্বিতীয় বড় লাইন হয়ে যেতে পারে — আর সেটা আসে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে, যখন টাকা আর থাকে না।

প্রতি প্লেটের সংখ্যা আর প্রত্যাশিত ভিড় প্রথম সভাতেই ঠিক করুন, আষাঢ়ে নয়। কিচড়ি ও ভোগ পুজোর সবচেয়ে প্রশংসিত কাজ, তাই এখানে কাটা নয় — সৎভাবে বাজেট করা ভালো।

২. পরিকল্পনার চেয়ে বড় করে বানানো প্যান্ডেল

প্যান্ডেল তৈরি হয় তাড়াহুড়োয়, গত বছরের জায়গা মাপ ধরে, আর নির্মাণের মধ্যেই সেটি বড় হতে থাকে — একটা অতিরিক্ত বে, উঁচু সম্মুখ, চওড়া প্রবেশপথ। প্রতিটি বাড়তি অংশ বদলে দেয় আলো, শ্রমিক আর বিসর্জনের পরিকল্পনা। বাঁশ কাটার আগে মাপ লিখিতভাবে ফ্রিজ করুন, আর তাতেই থাকুন।

৩. শেষ মুহূর্তে ডাকা শিল্পী

কুমারটুলি আর শহরের আর্ট-ছাত্ররা সপ্তাহ আগেই বুকিং শেষ করেন। দেরিতে বুক করলে আপনি হয় প্রিমিয়াম দিতে হয়, নয়তো এমন কাউকে পাচ্ছেন যে আপনার আকারে কখনও কাজ করেনি — আর থিমটাই দৃশ্যত সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হয়। কারিগর বুক করা একটি বাজেট-সিদ্ধান্ত, শৈল্পিক সিদ্ধান্ত নয়।

টাকা আসে কোথা থেকে

আয়ের দিকটাও ব্যয়ের দিকের মতোই কঠোরভাবে লাগাতে হয় — আর সেটি সাধারণত অনেক কম শৃঙ্খলাবদ্ধ।

  • চাঁদা ও রেফারেন্স — সাধারণত মোটের ৫০ থেকে ৭০%। বাড়ি বাড়ি সাবস্ক্রিপশন। পুজো চলবে কি না তা নির্ধারণ করে আসলে এই সংগ্রহের পদ্ধতি। বিস্তারিত আমাদের বন্ধুত্ব না হারিয়েই চাঁদা আদায়ের গাইডে।
  • প্যান্ডেলের ডোনেশন বাক্স। সিল করা বাক্স, তালা, দুইজনের স্বাক্ষরে গোনা আর প্রকাশিত দৈনিক হিসাব লাগে — নইলে এটি নীরবে কমিটির দ্বন্দ্বের উৎস হয়ে ওঠে।
  • স্পনসরশিপ ও বিজ্ঞাপন। স্থানীয় ব্যবসা প্যান্ডেলের ব্যানার, আলোর স্থান বা ঘোষণার সুযোগ নেয়। টাকা আসে সত্যি, সঙ্গে শর্তও থাকে — ব্র্যান্ডিং ফ্লেক্স ছাপার আগে ঠিক করুন, পরে নয়।
  • কমিটি সদস্যরা সাবস্ক্রিপশন। মূল দলের জন্য ভালো, একা ভরসা করার মতো আয়-পরিকল্পনা নয়।
  • প্যান্ডেলের অবশিষ্ট সম্পত্তি বিক্রি। পুনর্ব্যবহারযোগ্য বাঁশ, আলো, আর বিসর্জনের পর উদ্ধৃত্ত সামগ্রীর নিলাম বা দান। সামান্য কিন্তু সত্যিকার, আর পরিকল্পনা করলেই কাজে দেয়।

হিসাব সৎ রাখার নিয়ম

  • সব কিছুতে দুইটি স্বাক্ষর। একজন ব্যক্তির হাতে খরচ করা আর খরচ লেখা দুটোই থাকা উচিত নয়।
  • সপ্তাহে একবার নোটিশ বোর্ডে হিসাব। তারিখসহ রসিদ ও ব্যয়, যে কোনো সদস্য দেখতে পারেন। এটিই কমিটির সবচেয়ে সস্তা বিশ্বাস-যন্ত্র।
  • আত্মীয় নয়, এমন কেউ যে অডিট করবে। চূড়ান্ত সাধারণ সভার আগে দুই সদস্য ক্যাশ-বুক যাচাই করবেন।
  • ক্যাশ-বুক আর সংগ্রহ-বই আলাদা রাখুন। চাঁদার হিসাবের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেশানোই সবচেয়ে বেশি দ্বন্দ্বের কারণ।
  • শেষ হিসাব প্রকাশ করুন। প্যান্ডেলের ব্রুশুতে ছেপে দিন। যে কমিটি হিসাব প্রকাশ করে, পরের সাধারণ সভায় আর প্রশ্নের সামনে পড়ে না।

শাসন, দায়িত্ব আর বার্ষিক সময়সূচি নিয়ে বিস্তারিত কীভাবে সত্যিকারের কমিটি চালাতে হয় গাইডে।

পুজো না কেটে খরচ কমানোর ছয়টি উপায়

  • প্যান্ডেলের ফ্রেম পুনর্ব্যবহার করুন। বহু বছরের কমিটি বাঁশ ও ফিটিং জমিয়ে রাখে। এটিই সবচেয়ে বড় সম্ভব সাশ্রয়।
  • স্বেচ্ছাসেবকদের রান্না, নিজেরা। নিজেদের স্বেচ্ছাসেবকদের দিয়ে রান্না করলে খরচ হয় মালদায় — ক্যাটারিং-এর মার্জিনে নয়।
  • মূর্তি আর কারিগর ছাড়া সবকিছুতে স্বেচ্ছাসেবক শ্রম। আঁকা, ওয়্যারিং, প্যান্ডেল মেরামত, পরিষ্কার আর ভাসানোর রাত — সবই স্বেচ্ছাসেবকযোগ্য।
  • ছাপা আগে করুন। ফ্লেক্স, চিঠি আর ব্রুশু সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দামে পাওয়া যায়।
  • একটি থিম, চারটি নয়। প্রতিটি অতিরিক্ত অংশ মানেই আরেকটি কারিগর আর আরেকটি কাঠামো।
  • স্পনসরদের জিজ্ঞেস করুন জুনে, সেপ্টেম্বরে নয়। এক মাস আগে লোকাল কমানা উদার; এক সপ্তাহ আগে লোকাল কমানা লেনদেন।

যে চারটি কাটবেন না

  • মূর্তি। এটাই পুজোর কারণ, আর মানুষ আসে এটি দেখতেই।
  • পুরোহিত আর সামগ্রী। পূজার খরচ কমানো মানে পূজাই কমিয়ে দেওয়া।
  • খাবারের পরিমাণ ও মান। ভোগই কমিটির পুজো-অভিজ্ঞতার আসল মুখোশ।
  • বিসর্জনের লজিস্টিক ও নিরাপত্তা। ক্রেন, রাস্তা ছাড়া আর কর্মী। বিসর্জনের রাত বছরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রাত, আর এটিই সবচেয়ে কম বাজেট হয়।

একটি সহজ বাজেট-সময়সূচি

  • জুন – জুলাই: কমিটি গঠন, আনুমানিক খরচের ধারেপাকড়া, থিমের সংক্ষিপ্ত তালিকা, স্পনসরের সঙ্গে যোগাযোগ, কারিগরের ফার্স্টলাইন দেখা।
  • আগস্ট: লাইন-ধরে-লাইন বাজেট লিখে ওয়ার্ক, চিঠির হার চূড়ান্ত, সংগ্রহ দল নিযুক্ত, মূর্তির মাপ ও প্রস্তুতকারক বুক।
  • সেপ্টেম্বর: সংগ্রহ পূর্ণ গতিতে, ছাপার অর্ডার, প্যান্ডেলের তৈরি শুরু, প্রতি সপ্তাহে নোটিশ বোর্ডে হিসাব।
  • অক্টোবর: প্যান্ডেল সম্পূর্ণ ও সাজানো, আলো টেস্ট, মূর্তি বসানো, পুজো, বিসর্জন, হিসাব বন্ধ ও প্রকাশ।

এই সময়সূচিকে তারিখ-ভরা কাজে বদলে দেয় আমাদের দিনে দিনে পরিকল্পনার পাতা, আর ২০২৬ সালের তারিখ দুর্গাপূজার তারিখ পাতায়। ২০২৬ মরশুম ষষ্ঠী ১৬ অক্টোবর থেকে বিজয়াদশমী ২১ অক্টোবর পর্যন্ত।

পুজোর গান

Loading playlist…