কীভাবে চালাবেন দুর্গাপূজা কমিটি: দায়িত্ব, টাকা ও সময়সূচি
কমিটি একটি পদবি নয়, একটি কাজের বিবরণ
কলকাতার ছোট পুজোতে কমিটি মানে পাঁচ-ছয়জন মানুষ, যাঁরা জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত একশোটি ছোট ছোট কাজ একসঙ্গে করেন: সেই কারিগর বুক করা, চিঠি ছাপা, থিম নিয়ে ঝগড়া, ইলেকট্রিশিয়ন খোঁজা, আর বিজয়াদশমীর রাত দুইটায় রাস্তায় দাঁড়ানো। প্যান্ডেল কেমন হবে তা প্রায় পুরোটাই নির্ধারণ করে এই কাজগুলো কি নির্দিষ্ট কারো নামে বাঁধা পড়েছে।
তাই প্রথম প্রশ্ন কে সভাপতি হবে নয়। প্রশ্ন হলো — এই তালিকার প্রতিটি কাজের কি কোনো নাম সংযুক্ত আছে? যে কমিটির উত্তর হয়, ছোট বাজেটেই ভালো প্যান্ডেল বানায়। যেখানে উত্তর হয় না, সেখানে প্রতি বছর একই প্যান্ডেল হয়, আর প্রতি বছর তা নিয়ে আরও জোরে ঝগড়া হয়।
যে কাঠামো কাজ করে
- সভাপতি। সিদ্ধান্ত নেন, আর দায়ী। তাঁকে বাছাই করা উচিত সবার মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ নয়, বরং যিনি দশ মিনিটে একটি তর্ক মিটিয়ে দিতে পারেন।
- সচিব। ক্যালেন্ডার, মিনিট আর কাগজপত্রের দায়িত্ব তাঁর। বাস্তবে এই ভূমিকাই পুজোকে চালায়, এবং এটি সাংস্কৃতিক নয়, কাজের পদ।
- কোষাধ্যক্ষ। টাকা, ক্যাশ-বুক আর সংগ্রহ-বই তাঁর কাছে। তাঁকে একই সঙ্গে সংগ্রহকারী হওয়া উচিত নয়, আর একমাত্র স্বাক্ষরদাতা হওয়াও উচিত নয়।
- পাঁচ থেকে নয়জন সাধারণ সদস্য। এর বেশি নয়। বিশ সদস্যের কমিটি ধীরে সিদ্ধান্ত নেয়, তারপর সিদ্ধান্ত উপেক্ষাই করে।
- একজন অডিটর, কোষাধ্যক্ষের পরিবার থেকে নয়। মরশুম শুরুর আগেই ঠিক করতে হবে, অক্টোবরে হিসাব তৈরি হওয়ার পরে নয়।
- গলির জন্য একটি যোগাযোগ সদস্য। প্যান্ডেল নিয়ে প্রতিবেশীরা যাঁর কাছে ফোন করেন, সেই মানুষটি। এক নাম, এক নম্বর।
একটি কার্যকর পরীক্ষা: একজন প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করল “কাকে ফোন করব?” — একটাই উত্তর পেলে কমিটি ঠিক আছে। পাঁচজন সমানভাবে দায়িত্বীয় মনে করলে সেটার মানে কোনো সচিবই নেই।
প্রথম সভা: আসলেই যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেই আজন্ডা
বেশিরভাগ কমিটি এমন সাধারণ সভা করে যেখানে ভোগ কে রান্না করবে তা আলোচিত হয়, তারপর সভা ভেঙে যায়। যে একটি সভা আসলে গুরুত্বপূর্ণ, তাতে এই ছয়টি বিষয়, এই ক্রমে।
- গত বছরের হিসাব উপস্থাপন ও গ্রহণ। যে কমিটি গত বছরের হিসাব নস্ত করেনি, তার এ বছরের চাঁদা চাওয়ার নৈতিক অধিকার নেই। দশ মিনিট, রসিদ ধরে ধরে, আর তা গৃহীত হয় বা হয় না।
- নাম ধরে দায়িত্ব বণ্টন। দায়িত্ব আলোচিত নয়, নাম মিনিটে লেখা।
- আনুমানিক বাজেটের সীমা ঠিক করা। সীমা, সংখ্যা নয়। সংখ্যা আসে আগস্টে।
- থিমের সংক্ষিপ্ত তালিকা, সর্বোচ্চ তিনটি। প্রতিটির সঙ্গে আনুমানিক খরচ।
- তারিখ ঠিক করা। প্যান্ডেল তোলার শুরু, উদ্বোধন, প্যান্ডেল নামানোর দিন, বিসর্জনের দিন, আর চূড়ান্ত সাধারণ সভার দিন।
- চিঠির হার ঠিক করা, অথবা ঠিক করার তারিখ। এটি খোলা রেখে দিলেই শেষ সপ্তাহে টাকা নিয়ে ঝগড়া হয়।
তিরিশ মিনিট, এক ঘণ্টার বেশি নয়। এর বেশি হলে দরকারি সিদ্ধান্ত হারিয়ে যায়।
লিখিতে রাখা পাঁচটি জিনিস
এগুলোর কোনোটার জন্য আইনজীবী লাগে না। প্রতিটির একটি পাতা হওয়া, স্বাক্ষরিত, আর তালাভুক্ত থাকা দরকার।
- দায়িত্বের তালিকা। পাঁচ-ছয়টি ভূমিকা কী করার জন্য, কমিটির নিজের ভাষায়।
- বাজেট। লাইন-ধরে-লাইন, সাধারণ সভায় অনুমোদিত, তারিখসহ। কমিটির তৈরি করা সবচেয়ে কার্যকর একটি কাগজ এটিই।
- সংগ্রহের রেকর্ড। আগে নম্বর দেওয়া চিঠির বই, আর তার সঙ্গের দৈনিক হিসাবের ফলকা।
- ক্যাশ-বুক। সংগ্রহ-বই থেকে আলাদা, কারণ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস।
- মিনিট। প্রতি সভার একটি পাতা: তারিখ, কারা উপস্থিত, কী সিদ্ধান্ত হলো, কে কখন করবে। এটিই আগামী বছরের হস্তান্তরের ব্যবস্থা।
মিনিট ছাড়া প্রতি বছর কমিটি শূন্য থেকে শুরু করে। একই থিম নিয়ে আলোচনা হয়, একই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আর সেই একই দুইজন সব কাজ করে।
টাকা: বেশিরভাগ বিবাদ ঠেকানোর চারটি নিয়ম
- প্রতিটি খরচে দুইটি স্বাক্ষর, সবসময়। একজনের হাতে খরচ করা আর খরচ লেখা দুটোই থাকা উচিত নয়। কমিটির বেশিরভাগ সমস্যা একটি নিয়মেই ঠেকে।
- ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জমা। আদায় করা নগদ সেদিন রাতেই ব্যাংকে। কোনো বাড়িতে রাতে পড়ে থাকা নগদ থেকেই সংগ্রহ নিয়ে বিবাদ শুরু হয়।
- প্রতি সপ্তাহে নোটিশ বোর্ডে হিসাব। সংগ্রহ, ব্যয়, জেরা। তিনটি লাইন, তারিখসহ, সবার সামনে। কিছুই খরচ হয় না, আর এতে বেশিরভাগ সন্দেহ নিশ্চিত হয়ে যায়।
- চূড়ান্ত সভার আগে স্বাধীন অডিট। কোষাধ্যক্ষ বা তাঁর পরিবারের নয়, এমন দুইজন ক্যাশ-বুক রসিদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন।
টাকার পুরো দিক আমাদের একটি পুজো কমিটি আসলে কত খরচ করে আর বন্ধুত্ব না হারিয়েই চাঁদা আদায়ের গাইদে আছে।
কে কী করবে: দায়িত্ব-ভিত্তিক ক্যালেন্ডার
সারা বছরের কাজ এক নজরে।
জুন – জুলাই: ঠিক করা আর বুক করা
- সচিব: প্রথম সভা চালান, ক্যালেন্ডার ঠিক করা, আর আগেই পুরো মরশুমের সভার তারিখ বুক করা।
- সভাপতি: সম্ভাব্য স্পনসরের সঙ্গে কথা, কারিগরের ফার্স্টলাইন দেখা, বাজেটের বিপরীতে থিম ঠিক করা।
- কোষাধ্যক্ষ: বাজেটের ঘাটতি হিসাব, চিঠির হার ঠিক করা, সংগ্রহের বই খোলা।
- সদস্যরা: সংগ্রহের দল গঠন ও এলাকা ভাগ করে দেওয়া।
আগস্ট: লিখিতে রাখা
- কমিটি: লাইন-ধরে-লাইন বাজেট অনুমোদন। প্যান্ডেলের আকার ঠিক হয় এই সভায়।
- সভাপতি ও সচিব: কারিগর আর প্রতিমা-প্রস্তুতকারক বুক করা। স্লট সপ্তাহ আগেই ভরে যায়; এটিই মরশুমের সবচেয়ে সময়-সংবেদনশীল কাজ।
- কোষাধ্যক্ষ: সংগ্রহকারীদের হাতে চিঠির বই বিলি, আগে নম্বর দিয়ে।
সেপ্টেম্বর: তৈরি ও সংগ্রহ
- সবাই: নির্দিষ্ট সন্ধ্যার সময়ে, একই গলিতে সংগ্রহ, প্রতিদিনের হিসাব। প্রতিটি ভূমিকার জন্যই সবচেয়ে ব্যস্ত মাস।
- সভাপতি ও একজন সদস্য: প্যান্ডেলের জমি, পারমিট, প্যান্ডেল তোলা শুরু।
- সচিব: নোটিশ বোর্ডে সাপ্তাহিক হিসাব; সাইটে কোনো নির্দিষ্ট সদস্যের তত্ত্বাবধানে প্যান্ডেল তৈরি।
- প্যান্ডেলের দায়িত্বে একজন সদস্য: কারিগরি কাজের মালিক, খুব বেশি কিছু যোগ না করার সিদ্ধান্তসহ।
অক্টোবর: চালানো, তারপর বন্ধ করা
- পুরো কমিটি: পুজোর দিনগুলোতে প্রতি সন্ধ্যায় জায়গায়। নিজের পুজোর দিনে অনুপস্থিত কমিটি পুরো গলির চোখে পড়ে।
- কোষাধ্যক্ষ ও দ্বিতীয় স্বাক্ষরদাতা: প্রতি রাতে দুইজনের সামনে ডোনেশন বাক্স গোনা, লিখিত মোট সহ।
- সভাপতি: থানার সমন্বয়, রাস্তা ছাড়ানো, বিসর্জনের ক্রেন ও কর্মী।
- সচিব: হিসাব বন্ধ ও অডিট, চূড়ান্ত সাধারণ সভা আহ্বান, চূড়ান্ত হিসাবসহ ব্রুশু ছাপা।
বিসর্জনের পর: যেটা বাদ পড়ে
- উদ্ধৃত্ত বাঁশ, ফিটিং ও আলো বিক্রি বা জমিয়ে রাখা, আর তার আয় ক্যাশ-বুকে লেখা।
- সাধারণ সভায় চূড়ান্ত হিসাব গৃহীত হওয়া আর ব্রুশুতে ছাপা।
- আগামী বছরের জন্য একটি লেখা টীকা: কী ভালো হয়েছিল, কী হয়নি, কোন কারিগরকে আগে বুক করতে হবে, কোন গলিতে সংগ্রহ কঠিন।
- চিঠির বই আর্কাইভ করা।
শেষ টীকাটিই বার্ষিক কমিটি আর কমিটি-প্রতি-বছরের পার্থক্য। পুরোটা তারিখ-ভরা কাজে সাজানো আছে আমাদের দিনে দিনে পরিকল্পনার পাতায়, ২০২৬ সালের তারিখের সঙ্গে মিলিয়ে।
সভা চালানোর নিয়ম
- তিনটি সভাই যথেষ্ট: সিদ্ধান্তের জন্য একটি (জুলাই), বাজেট অনুমোদনের জন্য একটি (আগস্ট), হিসাব বন্ধের জন্য একটি (বিসর্জনের পরে)। এর বেশি সভা আলোচনা বাড়ায়, সিদ্ধান্ত নয়।
- বাজেট সভার আগে সাত দিনের নোটিশ, আর বাজেটের কাগজ আগেই পাঠিয়ে দেওয়া। যে বাজেট পড়ে না দেখে তা অনুমোদন করা সিদ্ধান্ত নয়।
- প্রতিটি সভার শুরুতে দশ মিনিট আগের সভার মিনিট পড়া, আর কী কী আসলে হয়েছে তা মিলিয়ে নেওয়া। এই একটি অভ্যাসই কমিটিকে নিজেকে প্রতি দায়িত্বীয় করে তোলে।
- মিনিটে সিদ্ধান্ত, নামসহ। “প্যান্ডেল ৪০ ফুট হবে” সিদ্ধান্ত নয়। “প্যান্ডেল ৪০ ফুট, অনুমোদিত, সু. দাশগুপ্ত সেই কাজে কারিগরকে জানাবেন” — এটি সিদ্ধান্ত।
কমিটি আসলে কীভাবে ব্যর্থ হয়
- সব সিদ্ধান্ত শেষ দশ দিনে। তখন কারিগর বুক হয়ে থাকে, হার ঠিক হয়ে যায় কে ফাঁকা আছে তার উপর, আর প্যান্ডেল হয় যা সেই সময় কারিগর পারতে পারেন।
- একজন করে আশি শতাংশ কাজ। সেই বছর চলে। অসুস্থ হলে, শহর বদলালে, বা সহজ ক্লান্ত হলে চলে না।
- হিসাব নেই, কারণ হিসাব অস্বস্তির। ফলে নিশ্চিত যে আগামী বছরের সংগ্রহ আরও কঠিন হবে।
- কোনো উত্তরাধিকারী নেই। প্রতি বছর শূন্য থেকে শুরু করা কমিটি কখনও উন্নত হয় না, কারণ কিছুই সামনে নিয়ে যায় না।
- কমিটি আসলে একটি সামাজিক ক্লাব। সাধারণ সভার জন্য নাশতা ছাড়া আর কিছু না ঠিক হলে এক বছরের মধ্যেই গলি বুঝে যায়।
ভালো চলার আসল চেহারা
ভালোভাবে চলা কমিটি মানে সবচেয়ে বড় প্যান্ডেল নয়। মানে এমন কমিটি, যেখানে দশমীর এক মাস পরে গলির কোনো মানুষের কষ্ট নেই।
- হিসাব প্রকাশিত ও ঠিক, আর আগামী বছরেও চাঁদা ওঠে একই গলি থেকে।
- ভোগ ভালো ছিল, প্যান্ডেল শেষ হয়েছিল, আর বিসর্জন নিরাপদ ছিল।
- টাকার জন্য কাউকে এমনভাবে দুইবার লাগাতে হয়নি, যেটা সে মনে রাখতে চায়।
- কমিটি প্রতি বছর যে তর্কটা করে, সেটা দশ মিনিটে মিটিয়েছিল।
- আগামী বছরের কমিটি শূন্য থেকে নয়, টীকা থেকে শুরু করে।
এটাই পুরো মাপ। বাকি সব সাজসজ্জা — যেটা বাড়ির কুমারটুলির কারিগরদের বিচ্ছুতি দেয় না, বেশ উচ্চমানের সাজসজ্জা।
সম্প্রদায়ের পুজোর বিভিন্ন রূপ জানতে আমাদের সর্বজনীন বারোয়ারি পুজো আর হাউসিং-সোসাইটি পুজো গাইড দেখুন।